সরিষা চাষের ঊপযুক্ত সময় এবং সরিষা চাষে মাটির বৈশিষ্ট্য

আরো পড়ুনঃ  তুলসী পাতার উপকারিতা ও অপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য 

সরিষা একটি শীতকালীন বা রবি মৌসুমের ফসল। এবং এর ভালো ফলনের জন্য শীতল আবহাওয়ার প্রয়োজন হয়। সরিষা চাষের জন্য উপযুক্ত সময় হল অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত , এবং দোআঁশ এবং বেলে দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। সাধারণত অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি (কার্তিক মাসের দ্বিতীয় থেকে শেষ সপ্তাহ) পর্যন্ত সরিষার বীজ বপনের সর্বোত্তম সময়।

সরিষা-চাষের-উপযুক্ত-সময়-এবং-সরিষা-চাষে-মাটির-বৈশিষ্ট্য

 কিছু দ্রুত বর্ধনশীল জাত (যেমন করি ৭ বা বিনা সরিষা ৮) ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ বা মাঝামাঝি পর্যন্ত বপন করা যেতে পারে, তবে ফলন কিছুটা কম হতে পারে। সরিষার ভালো বৃদ্ধির জন্য ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উত্তম। ফুল ফোটার সময় মেঘলা আকাশ বা বৃষ্টি ক্ষতিকর হতে পারে।

পেজ সূচিপত্রঃ সরিষা চাষের উপযুক্ত সময় এবং সরিষা চাষে মাটির বৈশিষ্ট্য 

সরিষার চাষের উপযুক্ত সময়

বিভিন্ন অঞ্চলের তারতম্য এবং জমির জো অবস্থা অনুসারে করি -৭ , কল্যাণীয়া, সোনালী সরিষা, বারি সরিষা -৬,বারি সরিষা -৭ও বারি সরিষা -৮ এর বীজ মধ্য অসীম থেকে মধ্য কার্তিক মাস (অক্টোবর) পর্যন্ত বোনা যায়। রাই-৫ এবং দৌলত কার্তিক থেকে অগ্রাহায়ন (মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর) মাস পর্যন্ত বপন করা যেতে পারে। দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলে যথাক্রমে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের সরিষার বীজ বুনতে হয়। দেশের মধ্যে অঞ্চলে অক্টোবরের তৃতীয় সপ্তাহে বীজ বুনতে হয়।নেপাস জাতের সরিষা মধ্য নভেম্বর পর্যন্ত বপন করা যায়। 

সরিষা চাষে মাটির ধরন বা বৈশিষ্ট্য

উর্বর ও মধ্যে উর্বর  দোআঁশ ও পলি দোআঁশ মাটি সরিষা চাষের জন্য উত্তম। মাটির বর্ণ গারো ধূসর হওয়া ভালো। লালমাটি বা কাকুর যুক্ত মাটিতে সরিষার চাষ ভালো হয় না। মাটির অম্ল মান ৬.০ থেকে ৭.০ এর মধ্যে থাকলে উত্তম। লোনা মাটিতে সরিষা ভালো হয় না। 

উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি সরিষার জন্য ভালো। আগাম পানি নিকাশ হলে মাঝারি নিচে জমিতে চাষ করা যায়। উঁচু নিচু জমিতে সরিষার চাষ করা যায় না। জমি উন্মুক্ত স্থানে হওয়া দরকার, যাতে সেখানে সারাদিন রোদ পড়ে। বর্ষাকালে প্রধানত বোনা আমন ও রুপা আমনের জমিতে শীতকালীন ফসল হিসেবে সরিষার চাষ করা হয়। এছাড়াও আন্তঃ ফসল হিসেবে উর্বর জমিতে এবং ফল বাগানে সরিষার চাষ করা যায়। 

 সরিষা চাষে উপযুক্ত জলবায়ু

সরিষা চাষে উপযুক্ত জলবায়ু কেমন হবে নিম্নে তা আলোচনা করা হলোঃ 

১।তাপমাত্রাঃ মধ্যম থেকে কম ১৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অধিক তাপ তেলের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। 

২। বায়ুর আপেক্ষিক আদ্রতাঃ ৫০ থেকে ৭০ ডিগ্রী। বায়ুর আদ্রতা বাড়লে পোকা ও রোগ বিশেষত্ব অল্টারনারিয়া পাতা ঢোসা ও জাত প্রকার প্রকোপ বাড়ে। 

৩। জীব বৈচিত্রঃ সরিষার চাষ এলাকায় পর্যাপ্ত মৌমাছি থাকতে হবে। এতে সরিষার পরাগায়ন ভালো হয়। কীটনাশক প্রয়োগ মৌমাছি না থাকলে ফসল কম হয়। 

৪। বৃষ্টিপাতঃ কম্বা বৃষ্টিহীন পরিবেশ সরিষা উৎপাদনের জন্য ভালো। 

৫। অতিবৃষ্টিঃ মৌসুমির শুরুতে নভেম্বর মাসে ও শেষে ফেব্রুয়ারি মাসে অতিবৃষ্টি সরিষার জন্য খুব ক্ষতিকর হয়ে থাকে। 

সরিষা চাষের জন্য জমি তৈরি পদ্ধতি

জমিতে চার থেকে ছয়টি চার্জ মই দিয়ে তৈরি করতে হবে। চাষ কম হলে সরিষা বীজের অঙ্কুরোদগমে বিঘ্ন ঘটে। মাটির যো অবস্থায় জমি চাষ দিতে হবে। জমি চাষ করার সময় ঢেলা থাকবে না। মাটি সমতল হবে। জমি চাষ করার সময় আগাছা ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে। যাতে ফসলের আগাছার প্রকোপ কম হয়। সরিষা জমির চাষ ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার গভীরে হওয়া দরকার। সরিষা জমিতে চাষ করার ফাঁকে ফাঁকে রোদ লাগাতে হবে। পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ করলে দুই থেকে তিনটি চাষ হয় যথেষ্ট। তবে ভালোভাবে চাষ মই দিয়ে জমি সমতল করতে হবে। 

বীজ বপনের পূর্বে করণীয়

বীজ বপনের পূর্বে ভিটাভেক্স-২০০ অথবা ক্যান্টন দিয়ে (২-৩ গ্রাম ছত্রাক নাশক/কেজি বীজ) বীজ শোধন করে বপন করতে হবে। বিনা সরিষার বীজ ব্যাভিস্টিন (২.৫ গ্রাম/কেজি)বা বেনলেট ১.৫ গ্রাম/কেজি) দিয়ে শোধন করতে হবে। 

বীজ বপন

বীজ বপন পদ্ধতিঃ 

বাংলাদেশ প্রধানত সরিষার বীজ ছিটিয়ে বপন করা হয়। তবে শাড়িতে বীজ বপন করলে ফসলের পরিচর্যা করতে সুবিধা হয়।। অবশ্য শাড়িতে বীজ বলতে কিছু অতিরিক্ত ব্যয় হয়।

বীজের হারঃ

প্রতি হেক্টর ৭ থেকে ৮ কেজি, গাছ সংখ্যা প্রতি বর্গ মিটারে ৪৫ থেকে ৬৫ টি(গাছের ধরন অনুসারে)।

সারির দূরত্বঃ

শাড়ি থেকে শাড়ির দূরত্ব ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার। 

স্যার প্রয়োগ পদ্ধতি

ইউরিয়া বীজ বপনের ৩০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে ১ বা ২ বার প্রয়োগ করতে হবে।
ইউরিয়ার উপরি প্রয়োগের পূর্বে জমির আগাছা দমন করতে হবে।
অর্ধেক ইউরিয়া ও অন্য সব সার জমি তৈরীর সময় প্রয়োগ করতে হবে। 
ইউরিয়া উপরে প্রয়োগের পর জমিতে শেষ দিয়ে দিতে হবে। 

সরিষা খেতে সেচ ব্যবস্থা

সরিষা-চাষের-উপযুক্ত-সময়-এবং-সরিষা-চাষে-মাটির-বৈশিষ্ট্য

সোনালী সরিষা, বারি সরিষা ৬ (ধলি),বারি সরিষা ৭ ও বারি সরিষা ৬ উফশী জাতসমূহ পানি সেচ দিলে ফলন বেশি হয়। বীজ বপনের ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে (গাছে ফুল আসার আগে) প্রথম সেচ এবং ৫০ থেকে ৫৫ দিনের মধ্যে (ফল ধরার সময়) দ্বিতীয় সেচ দিতে হবে। বাপনের সময় মাটিতে রস কম থাকলে চারা গজানো ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে একটা হালকা সেচ দিতে হবে। সেচের নিশ্চয়তা থাকলে স্যার বেশি দিতে হবে। 

আগাছা দমন 



বীজ বপন এর ১৫ থেকে ২০ দিন পর একবার এবং ফুল আসার সময় একবার নিলানি দিতে হয়। 

পোকার আক্রমণ ও দমন

সরিষাতে বিভিন্ন জাতের পোকার আক্রমণ হতে পারে। এসব পোকার মধ্যে প্রধান প্রধান ক্ষতিকর পোকা এবং প্রতিকার বা দমনের পদ্ধতি আলোচনা করা হলো।

সরিষার জাব পোকা

ক্ষতির লক্ষণঃ

১।পূর্ণবয়স্ক ও বাচ্চা উভয়ের সরিষার পাতা, কান্ড, পুষ্প মঞ্জুরী ও ফল হতে রস শুষে নেয়। 

২।আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে ফলের বৃদ্ধি বাধা প্রাপ্ত হয়, পাতা কুঁকড়ে যায়। 

৩। পোকা এক প্রকার রস বের করার ফলে মোল্ড ছত্রাক জন্মে আক্রান্ত স্থানে কালো হয়।

৪। ফল ধরার অবস্থায় বা তার পূর্বে আক্রমণ হলে প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। 

প্রতিকারঃ

১। অক্টোবরে আগাম সরিষা বপন করলে আক্রমণ কম হয় 

২। প্রতি গাছের ৫০ টির বেশি পোকা থাকলে ম্যালাথিওন ৫৭ ই সি বা সুমিথিওন ৫৭ স্প্রে করতে হবে।

সরিষার অন্যান্য প্রকার বর্ণনাঃ 

১।করাত মাছি শূটকীট পাতা খায় ম্যালাথিয়ন ২মিলি/লিটার পানি সুমিথিয়ন ১ মিলি/ লিটার পানি ।

২। পাতা বাছা শুটকিট পাতা ও ফল খায়। ছিদ্র করে ম্যালাথিয়ন ২ মিলি /লিটার পানি সুমিথিয়ন ২ মিলি লিটার পানি সুমিথিয়ন ১ / লিটার পানি।

রোগ দমন 

বাংলাদেশের সরিষার জমিতে প্রায় ১৫ ধরনের রোগ দেখা যায়। উচ্চ ফলন পেতে হলে এসব রোগের প্রতিকার করা দরকার। নিচে প্রধান তিনটি রোগের বিবরণ দেওয়া হলঃ

বর্ণনাঃ

১। সরিষা গাছের শিকড় থেকে ও পরজীবী উদ্ভিদ থেকে খাদ্য গ্রহণ করে বেঁচে থাকে। 

২। এর ফলে আক্রান্ত সরিষার গাছ দুর্বল হয়ে ফলন কমে যায় ।

৩। মাটিতে ফসলের পরিত্যক্ত অংশ এবং সেচের পানিতে এদের উৎপত্তি ও বিস্তার ঘটে। 

৪। বারবার একই জমিতে সরিষার চাষ করলে এই রোগ বৃদ্ধি পায়। 

প্রতিকারঃ

১। ফুল আসার পূর্বে পরজীবী উদ্ভিদ জমে থেকে উঠিয়ে ধ্বংস করে ফেলতে হবে। 

২। পরজীবীর বিকল্প পোষক ফসল তামাক ইত্যাদি কয়েক বছর চাষ করা যাবে না।

৩। অধিক পরিমাণ এটিএসপি প্রতি হেক্টরের 200 কেজি ব্যবহার করতে হবে। 

৪। আকাশ তো জমি গভীরভাবে লাঙ্গল দিয়ে চাষ করতে হবে। 

৫।২-৪- ডি  আগাছানাসক সব প্রয়োগ করা যায়। 

ডাউনি মিলডিউঃ

লক্ষনঃ

১। কি রোগে চারার বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়।

২। পাতায় সাদা দাগ হয় এবং নিচের দিকে দাগগুলো বেশি দেখা যায়। 

৩।ফলন কমে যায়।

প্রতিকারঃ

১। রিডোমিল ৭২ দিয়ে বীজ শোধন।

২।রিডোমিল ৭২ অথবা ডাইথেন এম ৪৫ ০.২% স্প্রে করা ৫ থেকে ৭ দিন পর পর।

ফসল পরিপক্কতার লক্ষণ

মাঠের পিন চতুর্থাংশ পাতা বিবর্ণ বা হলুদে হলেই বুঝতে হবে সরিষা পরিপক্ক হয়েছে। এই অবস্থায় ফসল সংগ্রহ করতে হবে। গাছ বেশি পরিপক্ক হলে ফল ফেটে বিষ মাটিতে পড়ে যায়। পরি জাতীয় সরিষা ৭০ থেকে ৯০ দিন এবং রাই জাতীয় সরিষা ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা যায়। 

ফসল সংগ্রহ ও সংরক্ষণ

সকালে ফসল তুলতে হয়। ফসল সংগ্রহের জন্য গাছ শিকড় সহ টেনে তোলা বা কাশি দিয়ে গাছ মাটির সমানে কেটেও নেওয়া যায়। ফসল তুলে তা কয়েকদিন রোদে শুকিয়ে গরু বা লাঠি দিয়ে টিটিয়ে মাড়াই করতে হয়। গাছ পরিবহনের সুবিধার্থে ছোট ছোট আটি বেঁধে নেওয়া হয়। ফসল মাড়াই করার পর কয়েকদিন রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। বীজের আদ্রতা ৬ থেকে ৮% হলে তার সংরক্ষণের উপযুক্ত হয়।
সরিষা-চাষের-উপযুক্ত-সময়-এবং-সরিষা-চাষে-মাটির-বৈশিষ্ট্য


সরিষার ফলন যা তো ব্যবস্থাপনা ভেদে হেক্টর প্রতি 600 থেকে 1500 কেজি হতে পারে। আসল সংরক্ষণ করার পূর্বে খেয়াল রাখতে হবে যেন তাতে মাটির ঢেলা বা আবর্জনা না থাকে। বায়ুরুদ্ধ পাত্র বা পলি থাইলিন লাইলিন করা বস্তায় সরিষা রাখা যায়। সরিষার পাত্র ব্যবস্থা ঠান্ডা ও শুষ্ক স্থানে রাখতে হবে। 

শেষ কথা 

প্রিয় পাঠক, আজকের আর্টিকেলে আমরা আপনাদের জানাতে চেষ্টা করেছি সরিষা চাষের উপযুক্ত সময় এবং সরিষা চাষে মাটির বৈশিষ্ট্য। আশা করি আপনারা উপরের আলোচনা সম্পূর্ণ মনোযোগ সহকারে পড়লে বিস্তারিত তথ্য ভালোভাবে জানতে পারবেন। আমার আর্টিকেলটি পড়ে যদি আপনাদের  উপকৃত হয় তবে আমার ওয়েবসাইটটি ভিজিট করুন এবং বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন। এতক্ষণ আমার সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ।











এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url