সরিষা চাষের উপযুক্ত সময় এবং সরিষা চাষে মাটির বৈশিষ্ট্য
আরো পড়ুনঃ ঢেঁড়সের ২০ টি উপকারিতা ও ৫ টি অপকারিতা
সরিষার চাষের উপযুক্ত সময় এবং সরিষা চাষে মাটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমরা অনেকেই জানি আবার অনেকেই জানিনা। তাই আজকে আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করব সরিষার চাষে উপযুক্ত সময় এবং সরিষা চাষে মাটির বৈশিষ্ট্য
সরিষা হলো তেল জাতীয় ফসল। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় চার লক্ষ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ করে থাকে। সরিষা চাষ একটি লাভজনক ফসল। যা নিজের পরিবারের তেলের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়া যায়। তাই দেরি না করে মূল আলোচনা করা যাক।
পেজ সূচিপত্রঃ সরিষা চাষের উপযুক্ত সময় এবং সরিষার চাষে মাটির বৈশিষ্ট্য
সরিষা চাষের উপযুক্ত সময়
সরিষার শীতকালীন ফসল। আদ্র এবং শুষ্ক আবহাওয়া প্রয়োজন সরিষা চষের জন্য।
বাংলাদেশের প্রায় চার লক্ষ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ আড়াই লক্ষ টন তেল পাওয়া যায়।
বিভিন্ন জাতের সরিষার বীজে প্রায় 40 থেকে 40% তেল থাকে। খোল প্রায় 40% আমিষ
থাকে। তাই কল গরু ও মহিষের জন্য খুব পুষ্টিকর খাদ্য।
বিভিন্ন অঞ্চলের তারতম্য এবং জমির জো অবস্থা অনুসারে টবি ৭, কল্যাণী, সোনালী
সরিষা, বারি সরিষা ৬, বারি, সরিষা ৭,বারি সরিষা ৮, এর বীজ মধ্যে আসিন থেকে মধ্য
কার্তিক মাস (অক্টোবর )পর্যন্ত বোনা যায়। রাই ৫, এবং দৌলত কার্তিক থেকে
অগ্রাহায়ন মধ্য আসীন থেকে মধ্য নভেম্বর মাস পর্যন্ত বপন করা যেতে পারে। বিভিন্ন
অঞ্চলের তারতম্য এবং জমির যে অবস্থা অনুসারে বারি সরিষা তেরো জাতের বীজ কার্তিক
মাসে প্রথম সপ্তাহ থেকে শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত উপযুক্ত সময়।
সরিষা চাষে মাটির বৈশিষ্ট্য
সরিষা চাষের জন্য মাটি নির্বাচন করা গুরুত্বপূর্ণ। ভালো সু নিষ্কাশিত পানি জমে না
এমন জমিতে সরিষা চাষ করলে ভালো ফলন দেয়। সরিষা চার্জে মাটি দেওয়ার বা বেলে
ধোঁয়াশ মাটিতে ভালো জন্মে। মাটির পিএইচ ৬ থেকে ৭.৫ এর মধ্যে থাকলে ভালো হয়।
উর্বর এবং মাঝারি উর্বর জমিতে চাষ করলে ভালো ফলন পাওয়া যায়। ছায়ামুক্ত সারাদিন
রোদে পড়ে এমন জমি নির্বাচন করতে হবে।
বর্ষায় পানি জমে থাকে এরকম জমিতে সরিষা চাষ করলে ফলন হয় না। বর্ষাকালে প্রধানত
বোনা আমন ও রুপা আমনের জমিতে শীতকালীন ফসল হিসেবে সরিষার চাষ করা হয়। এছাড়া পান
তো ফলন হিসেবে উর্বর জমিতে এবং ফল বাগানে সরিষা চাষ করা যায়। তবে লোনা মাটিতে
সরিষা চাষ করা যায় না।
সরিষা চাষের জন্য জলবায়ু
সরিষা হলো শীতকালীন ফসল। শুষ্ক এবং আর্দ্র আবহাওয়া/জলবায়ু প্রয়োজন সরিষা
চাষের জন্য। সাধারণত তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের
মধ্যে থাকলে সরিষার ফলন ভালো হয়। সরিষার চাষ এলাকায় পর্যাপ্ত মৌমাছি থাকতে হবে।
এতে সরিষার পরাগায়ন ভালো হয়। কীটনাশক প্রয়োগে মৌমাছি না আসলে ফসল কম হয়।
দৃষ্টিহীন পরিবেশে সরিষা চাষের জন্য ভালো।
সরিষা চাষের জমি প্রস্তুত
জমিতে চার থেকে পাঁচটি চার্জ দিতে হবে। মাটি যদি ঢিলাযুক্ত হয় তাহলে মাটির
ঝুরঝুরা করে নিতে হবে। সরিষার জমিতে যদি চাষ কম হয় তাহলে সরিষা বীজের
অঙ্কুরোদগমের ব্যাঘাত ঘটে। মাটি যদি ঢিলাযুক্ত হয় তাহলে মই দিয়ে ঢিলা গুলা ভেঙে
সমতল করে নিতে হবে। জমি চাষ করার সময় আগাছা পরিষ্কার করে নিতে হবে যেন সরিষার
ক্ষেতের আগাছার প্রকোপ কম হয়।
সরিষার বীজ শোধন করণ
বিজ রোপণের আগে বীজ শোধন করে নেওয়া জরুরি। কারণ অনেক বেশ বাহিত রোগ থাকে যা ফলন
কমায়। তাই বিশ ব্যাহিত রোগ থেকে মুক্তি পেতে বীজ শোধন করা জরুরি। বিষ বপনের
পূর্বে ভেটাবেক্স ২০০ অথবা ক্যাপ্টেন দিয়ে দুই থেকে তিন গ্রাম ছত্রাক নাশক/বিষ
সংশোধন করে বপন করতে হবে। বিনা সরিসার বীজ বেবিস্টিন ২.৫ গ্রাম/ভাবেন লেট ১.৫
গ্রাম দিয়ে শোধন করতে হবে।
সরিষার জমিতে সার প্রয়োগ
সরিষার জমিতে সার প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরী। কারণ জমি যদি বতর না থাকে তাহলে
সরিষা চাষ করে আরশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। তাই সরিষার জমিতে জৈব সার কম্পোস্ট
সার এবং রাসায়নিক সার দিতে হয়। জমির চাষের আগে আপনি যদি গোবর, ছাই এবং কম্পোস্ট
সার দিয়ে জমি চাষ হাল চাষ করেন। তাহলে জমি উর্বর হবে এবং রাসায়নিক সার অজৈব সার
তুলনামূলক কম লাগবে।
ইউরিয়া বীজ বপন এর ৩০ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে এক থেকে দুই বার প্রয়োগ করতে হবে।
ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া প্রয়োগের পূর্বে জমির আগাছা দমন
করতে হবে। অর্ধেক ইউরিয়া অন্য সব সার জমি তৈরীর সময় প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া
উপরের প্রয়োগের পর জমিতে শেষ দিতে হবে।
সরিষার জমিতে সেচ ব্যবস্থা
সরিষার জমিতে সেচ ব্যবস্থা রাখতে হবে। কারণ জমিতে মাঝে মাঝে সেচ দিয়ে মাটি
ভিজিয়ে দিতে হয়। অনেক সময় দেখা যায় মাটির রস সব চুষে উপরিভাগ ফেটে যায় তখন
হালকা করে শেচ দিতে হয়। সরিষার বীজ ছিটিয়ে দেওয়ার পরপরই হালকা করে শেষ দিতে
হয়। দ্বিতীয়বার শেষ দিতে হবে ২০ রোপনের ১০ থেকে ১২ দিন পর। তবে অবশ্যই আপনাকে
আবার অনুযায়ী শেষ দিতে হবে।
সরিষার জমিতে আগাছা দমন
বীজ বপনের পনেরো থেকে বিশ দিন পর একবার এবং ফুল আসার সময় একবার নিরানি দিতে হয়।
জমি আগাছা দমন করলে ফলন আরো ভালো হয় এবং পোকামাকড় ও রোগ বালাই কমে। এবং
পোকামাকড় ও রোগবালায় আগাছা পরিষ্কার করার সময় অনেক আগাছা অনেক জায়গায় দেখা
যায় যে, বেশি গাছ রয়েছে তখন গাছগুলো পাতলা করে দিলে রোগবালাই কম হয়। পর্যাপ্ত
আলো বাতাস পায় এবং ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব।
সরিষার জমিতে পোকামাকড় ও রোগ বালাই
সরিষার গাছে বিভিন্ন জাতের পোকার আক্রমণ হতে পারে। এসব পোকার মধ্যে প্রধান প্রধান
ক্ষতিকর পোকা এবং ক্ষতিকার প্রতিকার বা দমন পদ্ধতি আলোচনা করা হলো।
জাব পোকা: পূর্ণবয়স্ক বা বাচ্চা উভয় সরিষার পাতা, কান্ড, ফুল ও ফল হতে রস শুয়ে
নেই। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে ফলের বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়, পাতা কুঁকড়ে যায়
পোকা এক প্রকার রস বের করার ফলে মোল্ড ছত্রাক জন্মে আক্রান্ত স্থানে কালো হয়।।
ফল ধরার অবস্থায় বা তার পূর্বে আক্রমণ হলে প্রতিকার অবস্থা গ্রহণ না করলে
সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রতি গাছে 50 টির বেশি পোকা থাকলে
মালাথিওন ৫৭ ইঞ্চি বা সমীথিয়ন ৫৭ ই সি প্রে করতে হবে।
পরজীবী অল্টারনারিয়া ব্রাসিসি নামক ছত্রাক দ্বারা এর রোগের সৃষ্টি হয়।
প্রথমদিকে সরিষা গাছের নিচে বয়স্ক পাতায় এ রোগের লক্ষণ দেখা যায়। এ ছত্রাক এর
আক্রমণের গাছের পাতা, কাণ্ড ও ফলে চক্রাকার কালচে দাগের সৃষ্টি হয়। আক্রমণের
মাত্রা বেশি হলে পাতা ঝলসে যায়। হলে সরিষার ফলন খুব কমে যায় রোগমুক্ত বীজ বপন
করতে হবে। বীজ বপনের পূর্বে ভিটাবে ক ২০০ অথবা ক্যান্টন দিয়ে দুই থেকে তিন গ্রাম
ছত্রাকনাশক ২০ শোধন করে বপন করতে হবে।
ডাউনি মিলডিউ এই রোগে সারার বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। পাতায় সাদা দাগ হয় এবং
নিচের দিকে দাঁতগুলো বেশি দেখা যায় । ফলন কম হয়।
ফসল পরিপক্ক তার লক্ষণ
মাঠের তিন চতুর্থ অংশে পাতা বিবর্ণ বা হলুদে হলেই বুঝতে হবে সরিষা পরিপক্ষ
হয়েছে। এই অবস্থায় ফসল সংগ্রহ করতে হবে। গাছ বেশি পরিপক্ক হলে ফল ফেটে বিষ
মাটিতে পড়ে যায়। যেকোনো সরিষা মাঠে 80 থেকে ১০০ দিন পর্যন্ত থাকে। এর বেশি হলে
ফল পেকে মাটিতে ঝরে পড়ে। তাই ফসল অতিরিক্ত পাকার আগেই সংগ্রহ করতে হবে।
মাঠ থেকে ফসল সংগ্রহ
সকালে ফসল তুলতে হয়। ফসল সংগ্রহের জন্য গাছ শিকড় সহ টেনে তোলা বা কাঁচি দিয়ে
গাছ মাটির সামনে কেটেও নেওয়া যায়। ফসল তুলে তার কয়েকদিন রোদে শুকিয়ে গরু বা
লাঠি দিয়ে টিটিয়ে মাড়াই করতে হয়। দাস পরিবহনের সুবিধার্থে ছোট ছোট আঁটি বেঁধে
নেওয়া হয়। ফসল মাড়াই করার পর কয়েক দিন রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। বীজের
আদ্রতা ছয় থেকে আট পার্সেন্ট হলে তা সংরক্ষণের উপযুক্ত হয়।
ফসল সংরক্ষণ
ফসল সংরক্ষণ করার পূর্বে খেয়াল করতে হবে যেন তাতে মাটির ঢেলা বা আবর্জনা না
থাকে। বায়ুরুদ্ধ পাত্রে বা পলি, পলিথাইলিন লাইনিন করা বস্তায় সরিষা রাখা যায়।
সরিষা পাত্র বা বস্তা ঠান্ডা বা শুষ্ক স্থানে রাখতে হবে।
শেষ কথা
প্রিয় পাঠক, আজকের এই আর্টিকেল এর মাধ্যমে সরিষা চাষের উপযুক্ত সময় এবং সরিষা
চাষে মাটির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অবশ্যই আর্টিকেল পড়ে আপনারা
সরিষা চাষের প্রয়োজনীয় সবকিছু বুঝতে পেরেছেন। তবে একটা কথা না বললেই নয় সেটা
হলো সবকিছুতেই যত্ন লাগে। তাই সঠিক পরিচর্যা ও যত্ন করে সরিষা চাষ করে অধিক ফলন
ঘরে তোলে আর্থিক লাভবান হন।
পুষ্টি ধৈর্য সহকারে পড়ার জন্য ধন্যবাদ। পোস্টটি পড়ে যদি আপনার ভালো লাগে তাহলে
কমেন্ট করবেন। আমাদের নতুন নতুন পোস্ট পেতে ওয়েবসাইট নিয়মিত ভিজিট করবেন।
এতক্ষণ সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ।

.webp)
.webp)
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url