আধুনিক উপায়ে মিষ্টি তেতুল চাষ পদ্ধতি বর্ণনা
তেঁতুল (ইংরেজি নাম: Tamarind; বৈজ্ঞানিক নাম: Tamarinds inmarinds ) দেখলে এমন কি নাম শুনলেও জিব্বায় পানি আসে না এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম আছে। বিশেষভাবে মহিলা ও ছেলে-মেয়েদের কাছে এটা খুবই যুক্তিযুক্ত।
আর তেতুল যদি মিষ্টি হয় অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন তেতুল আবার মিষ্টি হয়? হ্যাঁ তেঁতুল মিষ্টি হয় । অনেক বেশি মিষ্টি হয় এবং সেটি মিষ্টি জাতের তেতুল। যারা খেয়েছেন তারা নির্দ্বিধায় শিকার করবেন কিন্তু যারা খাননি তাদের সন্দেহ থেকে যাবে।
পোস্ট সূচিপত্র আধুনিক উপায়ে মিষ্টি তেতুল চাষ পদ্ধতি বর্ণনা
- ভূমিকা
- মিষ্টি তেতুল চাষ
- মিষ্টি তেতুলের ঔষধি ব্যবহার
- মিষ্টি তেতুলের জাত নির্ধারণ
- মিষ্টি তেতুলের বংশ বিস্তার
- মিষ্টি তেতুলের বীজ থেকে চারা তৈরি
- মিষ্টি তেতুলের রোগবালাই ও পোকামাকড় দমন
- মিষ্টি তেতুলের ফলন
- শেষ কথা
ভুমিকা
বাংলাদেশের অপ্রধান ফল সমূহের মধ্যে তেতুল অন্যতম। সাধারণভাবে তেতুলকে একটি
উৎকৃষ্ট ফল হিসেবে গণ্য করা যায় না, তবে ব্যবহার, বৈচিত্র্য ও জনপ্রিয়তার
বিচারে ইহা বাংলাদেশের একটি অতি সমদৃত ফল। আফ্রিকার শাবানা অঞ্চলের উৎপত্তিস্থল।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও এর চাষ হচ্ছে। বিশেষ করে
শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, বার্মা, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও
ইন্দোনেশিয়ায় উল্লেখযোগ্য।
তেতুল একটি বৃহদাকার চিরহরিৎ বৃক্ষ। তবে শীতকালে বেশি দীর্ঘ হলে পত্র পতনশীল
স্বভাবের হয়ে যায়। পাতা যৌগিক প্রতি পাতায় ১০ থেকে ২০ জোড়া কোন পত্রক থাকে।
তেঁতুল একটি Leguminousপরিবারের ফল। কাঁচা অবস্থায় ফলের সবুজ ত্বক শ্বাসের সাথে
মিশে থাকে। পাকার পর ত্বক ফেটে রং ধারণ করে ও শ্বাস ২০ থেকে আলাদা হয়ে যায়।
থাকার পরও ফল অনেকদিন গাছে ঝুলে থাকে। তেতুলের কাঠ খুবই শক্ত,ভারি,দৃড়, টেকসই ও
সহসা ঘন ধরে না। কাঠ দেখতে রক্তাক্ত বাদামী বর্ণের। গরুর গাড়ির চাকা, ঢেঁকি,
ঘানি, আসবাবপত্র বানাতে ব্যবহৃত হয়।
আরো পড়ুনঃ হাঁটুর ব্যাথা দূর করার ঘরোয়া উপায়
তেতুলের পাতা থেকে হলুদ রং পাওয়া যায়। বাকোলের ট্রেনিং চামড়ার ট্যান করতে এবং
কাঠের গুঁড়ো দিয়ে চামড়া অপসারণ করা যায়। তেঁতুল বেশ গরম পানিতে উত্ত্যক্ত করে
একপ্রকার গাম বা আঠা তৈরি করা হয়। এবং এটা পেইন্টিং কাজে ব্যবহৃত হয়। তেতুলের
মন্ড ঔষধ, খাদ্য ও ধাতব পত্র পরিষ্কার ব্যবহৃত হয়। তেতুল গাছের প্রতিটি অঙ্গ
ব্যবহৃত হয়। এর পাতা, ফুল ও অপরিপক্ক ফল তরকারি, সালাদ ও সুবে ব্যবহৃত হয়। পাকা
ফল টাটকা অবস্থায় খাওয়া ছাড়াও নানাভাবে প্রক্রিয়াজাত করা যায়। চাটনি ,সস,
শরবত তৈরিতে ইহার ব্যবহার ব্যাপক।
মিষ্টি তেতুল চাষ
থাইল্যান্ডের মিষ্টি তেতুলের বীজ পরিষ্কার পানিতে (ঘরের তাপমাত্রায়, ২০-২৬
সেলসিয়াস) ৩ দিন ভিজিয়ে রাখতে হবে। তারপর উষ্ণ পানিতে (প্রায় ৪০ থেকে ৪৫
সেলসিয়া) ২৪ ঘন্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে। তারপর তাৎক্ষণিকভাবে ছায়াযুক্ত স্থানে
বীজ বপন করতে হবে। বীজ অঙ্কুরিত হতে শুরু করলে, একটি উজ্জ্বল জায়গায় স্থানান্তর
করতে হবে, পরবর্তীতে রোপন এবং যত্ন নিতে হবে।
মিষ্টি তেতুলের ঔষধি ব্যবহার
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে তেঁতুলকে বলা হয়েছে যমদূতিকা। আবার একে অভিহিত করেছেন
প্রাণদায়িনি ও শক্তিধারিনী হিসেবে । রোগ প্রতিকারের তেতুলের ব্যবহার অনেক--
১। তেতুলের শরবত কোলেস্টরেলের মাত্রা কমায়। তেতুলের আধুনিক ব্যবহার হচ্ছে রক্তে
কোলেস্টেরলের মাত্রা কমানোর ক্ষেত্রে। তেতুল যে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় তার
কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলেও গবেষণায় দেখা গেছে যারা নিয়মিত তেতুল খায়,
তাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা একেবারেই কম।
২। ভেষজবিদগণের মতে নিয়মিত তেতুল খেলে শরীরের সহজে মেদ জমে না।
৩। বাতের ব্যথায় যারা কষ্ট পান তাদের জন্য তেতুল পাতা খুবই ভালো ওষুধ।
৪। তেতুল পাতার রসের শরবত খেলে প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া থাকে না।
৫। অর্শ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা পুরনো তেঁতুল সিদ্ধ পানি খেলে অধিকাংশ ক্ষেতের
উপশম হয়।
৬ সর্দি হলে কচি তেতুল পাতা সিদ্ধ রস করাইতে সরিষার ফোড়ন দিয়ে খেলে সর্দির
উপশম হয়।
৭। সর্দি --বমিতে হাত--পা অবশ্যই পড়েছে বলে মনে হলে, সেক্ষেত্রের কাঁচা তেতুল
পুড়িয়ে বা পুরাতন তেতুলের শরবত বানিয়ে খেলে এ অসুবিধা কমে যায়। তেতুল টেরামিক
এসিড, মিলিক এসিড, পলি স্যাকারাইড, টারটারিক এসিড, পটাশিয়াম টারটারেট, ইনভার্ট
সুগার,গাম ও পেকটিন থাকে, যা ইহার বিশেষ সাধের জন্য দায়ী। এই এসিড অত্যন্ত টক
কিন্তু যথেষ্ট পরিমাণে শর্করা থাকার ধরণ ফল যতটুকু টক হওয়ার কথা তা হয়
না।
মিষ্টি তেতুলের পুষ্টি উপাদান
তেঁতুলের যথেষ্ট পরিমাণে পুষ্টি উপাদান থাকে যা আমাদের শরীরের ক্ষেত্রে খুব
গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয়।
- প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে---২৩০-২৮৩ কি, ক্যালরি,
- থায়ামিন,০.১৬ মিলি গ্রাম
- রিবোফ্লেভিন,২.১ মিলি গ্রাম
- ভিটামিন সি,৫৪ মিলি গ্রাম
- ক্যালসিয়াম ১ মিলিগ্রাম
- ও লৌহ ১ মিলিগ্রাম থাকে
মিষ্টি তেতুলের জাত নির্ধারণ
তেতুলের প্রধানত দুই রকমের জাত দেখা যায়। টক জাত মিষ্টি জাত। টপ যাতে এসিদের
পরিমাণ বেশি থাকে কিন্তু মিষ্টি যাতে সাধারণত মুক্ত এই শীতের পরিমাণ অনেক কম থাকে
বলে মিষ্টি হয়। এ জাতটি প্রধানত টাটকা ফল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। থাইল্যান্ড,
ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়াতে এ মিষ্টি জাতের তেতুল বাণিজ্যিকভাবে চাষ
করে। এ তেঁতুল চাষ করে তারা বিশেষতঃ ইউরোপ ও আমেরিকা সহ অন্যান্য দেশের রপ্তানি
করে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের, বাউ- জার্মপাজম
সেন্টারে জাত নিয়ে কাজ করছে দীর্ঘদিন যাবত। এখানে মিষ্টি তেতুলের অনেকগুলো
একসেশন আছে।
মিষ্টি তেঁতুলের বংশবিস্তার
তেতুলের বংশবিস্তার এখনো পর্যন্ত প্রধানত বিষ দিয়েই করা হয়। তবে কাটিং,
লেয়ারিং ও গ্রাফটিং ও করা যায়। কাটিং, লেয়ারিং ও গাবটিং প্রধানত এপ্রিল থেকে
আগস্ট মাসে করা হয়। কোন কোন ক্ষেত্রের উক্ত পদ্ধতি গুলোতে ৩০ থেকে ৮০ভাগ সফল
হয়।
মিষ্টি বীজ থেকে চারা তৈরি
ফল থেকে বীর সংগ্রহের সময় ফেব্রুয়ারি --মার্চ । প্রতি ফলে ২ থেকে ১২ টি
খয়েরি বা কালচে বর্ণের চকচকে বীজ থাকে। গাড় খয়েরি রং এর মোটা খোসা মুক্ত
ফল সংগ্রহ করার পরে বীজ সংগ্রহ করে তা বীজ তলায় বপন করতে হয়। বীজ বপনের
১০--১৫ দিনের মধ্যে চারা গজায়। বীজ ২৪ ঘন্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে তারপর বপন করলে
ফোন করে দিব মেয়ের হার শতকরা ৭০-৯০ ভাগ হয়।চারা অবস্থায় তাড়াতাড়ি বাড়ে তবে
একটু বড় হয়ে গেলে বৃদ্ধি কমে যায়।
বীজ পলি ব্যাগে অথবা বীজ তলায় চা দিয়ে চারা গজানো যায়। তারপর বর্ষার পরে ৫
মি,×৫, দূরত্বে। ৭৫ সে ,মি×৭৫ সে,মি×আকারের গর্ত করে গর্তের মাটির সাথে 40 কেজি
পরিমাণ পচা গোবর ভালোভাবে মিশিয়ে গাছ লাগানো যায়। তবে পরবর্তী বছরে গাছ বাড়ার
সাথে সাথে পচা গোবর সারের সাথে অন্যান্য রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে।
মিষ্টি রোগ -বালাই ও পোকামাকড়
তেতুলের উল্লেখযোগ্য পোকামাকড় ও রোগের আক্রমণ নেই। তবে স্কেল
ইনসেকট,মিলিবাগ,এসিড, সাদা মাছি পোকা, থ্রীপস ও ফ্রুট রোবারের আক্রমণ দেখা যায়।
এসব পোকামাকড় দমনের জন্য সাইবার মেথিন গ্রুপের যেকোন ইনস্টিসাইড ব্যবহার করে
সহজেই দমন করা যায়।
মিষ্টি তেতুলের ফলন
বীজের গাছের ফল আসতে ৭-১০ বছর সময় লাগে। তবে পঙ্কজ উপায়ে তৈরি কৃত গাছে ফল আসতে
চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে বছরে ২০০ থেকে ৭৫০ কেজি
পর্যন্ত ফল পাওয়া যেতে পারে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এক সময় এ দেশ
তেতুলের চাহিদা মেটাতে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল কিন্তু ইটের ভাটায় তেঁতুলের কাঠ
জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং বাড়ির আশেপাশেও জঙ্গলে তেতুলের গাছ থাকায় এবং
তেতুলের গাছে ভূত থাকা নিয়ে কুসংস্কারের কারণেও অনেক গাছ কেটে ফেলা হয়েছে।
এ কারণে বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকার তেতুল আমদানি করতে হয়। এজন্য বামন জাতের
তেতুল বাড়ির আশেপাশে ও লম্বা জাতির তেতুল পাকা রাস্তার ধারে। রেল লাইনের ধারে ও
পতিত জ্যোতিতে লাগানো যেতে পারে। তাহলে তেতুলে আমরা আমাদের চাহিদা মেটাতে সব সম
হব এবং চাহিদার অতিরিক্ত তেতুল বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা
সম্ভব হবে।
শেষ কথা
প্রিয় পাঠক, আজকে আর্টিকেল থেকে আপনাদের জানাতে চেষ্টা করেছি, আধুনিক উপায়ে
মিষ্টি তেতুলের বংশবিস্তার, নিয়ে পুরো বিশ্লেষণ। আশা করি পুরো আর্টিকেলটি মনোযোগ
সহকারে পড়লে আপনাদের খুব ভালো লাগবে এবং উপকৃত হবেন। তেতুল অত্যন্ত পুষ্টিকর
একটি খাবার, তেতুল আমাদের সবার বড় উপকার করে আসে।
তেতুলের গুনাগুন বলে শেষ করা যায় না। তেতুল একটি অতি লোভনীয় ফল। এরকম তথ্যমূলক
পোস্ট করতে চাইলে আমাদের ওয়েবসাইটটি ভিজিট করুন। আশা করছি উপরের পুরো আর্টিকেলটি
মনোযোগ সহকারে পড়লে আপনাদের ভালো লাগবে এবং আপনাদের মনে কোন প্রশ্ন থাকলে আমার
কমেন্ট সেকশনে কমেন্ট করবেন এবং লাইক দিবেন বন্ধুদের সাথে শেয়ার করবেন। এতক্ষণ
সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ।
.webp)

.webp)
অর্ডিনারি আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url